3 Jul 2018

জাপান কেন বাঙালির বন্ধু

জাপানীরা কেন বাঙালিদের ভালোবাসে?

জাপানীরা ১৯৩৭ সালে নানকিং (এখন নানজিং) এ চাইনিজদের কচুকাটা করেছিলো। খুন -ধর্ষণ মিলিয়ে এমন নৃশংসতা কমই দেখেছে বিশ্ব। The flowers of war নামে একটি মর্মস্পর্শী মুভি আছে এই গণহত্যা নিয়ে। জাপানীরা এর আগে পরেও লাখে লাখে মরেছে-মেরেছে। শেষতক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জব্দ জাপান বাধ্য হয়েই রক্তের নেশা ছেড়ে জাতি গঠনে মনোযোগ দিয়েছিলো বলেই আজ তারা পৃথিবীর অন্যতম সভ্য জাতিতে পরিণত হতে পেরেছে। এই জাতি গঠনের পিছনে জাপানীরা চিরকৃতজ্ঞ কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া একজন বাঙালির কাছে। মিত্রপক্ষের চাপ সত্বেও ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধ টাইব্যুনালের 'টোকিও ট্রায়াল' ফেজে এই বাঙালি বিচারকের দৃঢ অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণের উপরে বেঁচে গিয়েছিলো। নয়তো যে ক্ষতিপূরণের বোঝা মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেনন তার দায় এখন পর্যন্ত টানতে হতো জাপানকে। সেক্ষেত্রে ঋণের বোঝা টানতে টানতে জাতি গঠনের সুযোগই  আর পাওয়া হতোনা জাপানের। সেসময়ই জাপানী সম্রাট হিরোহিতো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, "যতদিন জাপান থাকবে বাঙালি খাদ্যাভাবে,  অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নি:স্বার্থ বন্ধু।" এটি যে শুধু কথার কথা ছিলোনা তার প্রমাণ আমরা এখনো দেখতে পাই। জাপান এখনো বাংলাদেশের সবচে নি:স্বার্থ বন্ধু। এই ঘটনার প্রায় ৬৫ বছর পর ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিসান হামলায় প্রাণ গেলো নয় জাপানিজ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের। জাপান তখনও পাশে ছিলো বাংলাদেশের।

আর কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া সেই বাঙালি বিচারকের নাম এখনো জাপানী পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তাঁর নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু মেমোরিয়াল ও মনুমেন্ট। এই বিস্মৃত বাঙালির নাম বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭)।  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছাড়াও জীবদ্দশায় অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে তিনি কুষ্টিয়ায় নিজ গ্রামের স্কুল ও রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে প্রভাষক ছিলেন।  কিছুদিন ময়মনসিংহ কোর্টে আইন ব্যবসাও করেছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই জাপানীদের বাংলাদেশের প্রতি নি:স্বার্থ সহযোগী মনোভাব দেখে এর কারণ কি হতে পারে ভাবতাম। পরে কারণ জানার পর ভদ্রলোককে নিয়ে লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়ে উঠছিলো না অনেকদিন। আজ ভারমুক্ত হলাম। গুগল করলে আরো ডিটেইলস পাবেন। নেটফ্লিক্সে পাবেন টোকিও ট্রায়াল নামের সিরিয়াল যেখানে রাধাবিনোদের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ইরফান খান।

এই মেধাবী বাঙালিকে আমরা প্রায় কেউই মনে রাখিনি। বাঙালির মেধাগত বীরত্বের এই চমৎকার অধ্যায়টা জানে খুব অল্প মানুষ! অথচ কত ঠুনকো বিষয়ই না বাঙালি মানসে পায় সীমাহীন গুরুত্ব!

18 Dec 2017

দূর্লভ বনছাগল: মন খারাপের গল্প

দূর্লভ বনছাগল: মন খারাপের গল্প

আমাদের একদিনের হরিণের মাংস খাবার বিলাস যেভাবে ধ্বংস করছে আমাদের প্রাণীবৈচিত্র‍্য

মদক পেরোবার পর একটা ঝিরি দেখিয়ে তিনি বললেন এই ঝিরিতে গত পরশু তার ফাঁদে হরিণ পড়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হরিণ? সে বললো লাল হরিণ। সাইজ জিজ্ঞেস করলে জানালো বড় ছাগলের সাইজ। মনে মনে ধরে নিলাম সহজলভ্য বার্কিং ডিয়ার বা মায়া হরিণ হবে হয়তো। রাতে পাড়ায় ফেরার পর বৌদি আফসোস করলেন গতকাল আসলে হরিণের মাংস খাওয়াতে পারতেন ইত্যাদি। শেষে চাঙের উপর থেকে ছবির মাথাটা বের করে দিলেন। দেখেই চিনলাম এতোক্ষণ হরিণ সাব্যস্ত করা হলেও এটি ছিলো বনছাগল। পরে শিকারীকে ধরলাম। উনার ভাষ্যমতে উনার চেনা একটা স্পেসিফিক জায়গায় এখনো বেশ ভালো পরিমাণে বনছাগল থাকে। জায়গাটায় বিশাল বিশাল সব পাথুরে গুহা। খাড়া পাথুরে ক্লিফ পাহাড়ের গায়ে। আমি মিলিয়ে নিলাম। এর আগে হাজারীখিল আর কাপ্তাই এর বনে বনছাগল থাকার কথা শুনেছিলাম। হাজারীখিলে হারুয়ালছড়ি খালের ১০কিলোমিটার উজানে "বনমানুষের গুহা" নামে পরিচিত এক পাথুরে জায়গাতেও বনছাগল দর্শনের প্রত্যক্ষদর্শী পেয়েছিলাম। দুই দুই চার মিললো।

বনছাগল বা সেরাও(serow) সন্ধ্যা ও ভোরে খেতে বের হয় আর বাদবাকী সারাদিক চিপায়-চাপায় বসে জাবর কাটে। ঝোপঝাড়ে, পাথুরে ঢালে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে পারে বলে এদের দেখা পাওয়া খুব মুশকিল। এদের এক ধরণের গন্ধগ্রন্থি থাকে যার সাহায্যে এরা গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে টেরিটোরি মার্ক করে রাখে।

বনছাগল অত্যন্ত বিপন্ন ও দূর্লভ প্রাণী। অথচ আমরা জেনে-না জেনেই এদের ধ্বংস করে ফেলছি। এরা এত দূর্লভ যে প্রকৃতিতে মুক্ত বনছাগলের ছবি কেউ বাংলাদেশে তুলতে পারেনি বা আমার চোখে পড়েনি। সবখানে বর্ণনা শুনে হাতে আঁকা ইলাস্ট্রেশন ব্যবহৃত হয়েছে। এই দূর্লভ সুন্দর এর দেহাংশের কপালের নরম পশমে হাতটা বুলিয়েই আমাকে তৃপ্ত থাকতে হলো এবারের মত!

যারা পাহাড়ে যান দয়া করে পাহাড়ী দাদারা অফার করলেও হরিণের মাংস খাবেন না। আপনার আগ্রহ তাদের শিকারে উৎসাহ যোগাবে। আপনার রিফিউজ তাকে নিরুৎসাহিত করবে। ভ্রমণে এইটুকু প্রজ্ঞার পরিচয় তো আমরা দিতেই পারি?

( বন্দী অবস্থায় তোলা একটি বন ছাগলের ছবি দিলাম। সাথে একটি সংগ্রহীত উপাখ্যান)
কাপ্তাইয়ে বন ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ সফিকুর রহমান ১৯৯৪ সালে আমাকে বলেছিলেন, সেখানকার গহিন অরণ্যে তিনি বনছাগল দেখেছেন। সেবার আমি তাঁর সঙ্গে দুই দিন ঘোরাঘুরি করে চশমাপরা ও রেসাস বানর ছাড়া অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেখা পাইনি। এরপর অনেক সময় গড়িয়েছে। যতবারই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, বনছাগলের খোঁজ নিয়েছি। যখনই তিনি বনছাগল দেখেছেন বা তথ্য পেয়েছেন, আমাকে জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিনি ১২-১৩ বার বনছাগল দেখেছেন। কিছুদিন আগে তাঁর সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, তখন বলেছিলাম, এবার দেখলে যেন ছবি তোলার চেষ্টা করেন। যা হোক, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি তাঁর ফোন পেলাম। তিনি বললেন, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই অঞ্চলের গহিন অরণ্যে (সংগত কারণেই জায়গার নাম উল্লেখ করা হলো না) কিছু আদিবাসী দুটি বনছাগলের দেখা পেয়েছিলেন। খবর শুনে তিনিও রওনা হয়ে যান। আদিবাসীরা ভোররাতে পাহাড়ের নিচের দিকে বিচরণরত বনছাগলটিকে তাড়া করেছিল। এতে ছাগলটি খানিকটা আহত হয়েছিল। ততক্ষণে তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছেন। ফলে ছাগলটি রক্ষা পায়। বিশ্রাম ও কিছু চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার পর সেটি নিজে নিজেই পাহাড়ের চূড়ায় হারিয়ে যায়। তিনি আমাকে ই-মেইলের মাধ্যমে বনছাগলটির ছবি পাঠালেন। সফিকুর রহমানের তোলা ছবিটিই আমার মনে হয় দেশের প্রথম কোনো সত্যিকারের বনছাগলের ছবি। এ দেশ থেকে প্রকাশিত বন্য প্রাণীর কোনো বইয়ে এখনো জীবন্ত বনছাগলের ছবি ছাপতে দেখিনি, সব অঙ্কিত
লিখেছেন: প্রাণীবিজ্ঞানী ডক্টর আমিনুর রহমান

6 Dec 2017

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রাচীনতম মাদ্রাসার নিদর্শন: দারসবাড়ি মাদ্রাসা

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রাচীনতম মাদ্রাসার নিদর্শন: দারসবাড়ি মাদ্রাসা
ওমরপুর, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ঠিক এভাবেই এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে নির্মাণকাল জানা গেছে ১৫০৪ সাল। নির্মাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। ছোট সোনা মসজিদও তাঁর কীর্তি। আলাউদ্দিন হোসেন শাহর সময়কে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমৃদ্ধির কারণে বাংলার স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। তাঁর সময়ে শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। হোসেন শাহ নির্দেশ দেন কোথাও যাতে ধর্মপ্রচারে তাঁদের বাঁধা দেয়া না হয়। তিনি সাহিত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেকালে সাহিত্য চর্চা করতেন মূলত হিন্দু পন্ডিতেরা। মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, মনসামঙ্গল, পান্ডববিজয় প্রভৃতি গ্রন্থের প্রারম্ভে হিন্দু পন্ডিতেরা কোথাও তাঁকে কলিযুগে কৃষ্ণের অবতার, কোথাও বা অর্জুনরূপে প্রশংসা করেছেন।

যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি। যদিও আজ থেকে শতাধিক বছর আগে প্রখ্যাত আর্কিওলজিষ্ট কানিংহাম ফিল্ড ভিজিটে এসে এটিকে দারসবাড়ি বা কলেজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই একে সবচে প্রাচীন মাদ্রাসা রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে কিন্তু আমি যা দেখলাম স্থাপনাশৈলী আমাকে বৌদ্ধ বিহারগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলো। কে জানে হয়তো কোন এক পরিত্যক্ত বিহারের উপরেই গড়ে উঠেছিলো হয়তো এই মাদ্রাসা! ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া বাঁকের খবর কজনই বা রেখেছে!

ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি কানসাট। সেখান থেকে অটো নিয়ে দারসবাড়ি মাদ্রাসা

4 Dec 2017

বাংলার প্রথম মাদ্রাসা: দারসবাড়ি মাদ্রাসা

বাংলার প্রথম মাদ্রাসা: দারসবাড়ি মাদ্রাসা
ওমরপুর, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ঠিক এভাবেই এটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে নির্মাণকাল জানা গেছে ১৫০৪ সাল। নির্মাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। ছোট সোনা মসজিদও তাঁর কীর্তি। আলাউদ্দিন হোসেন শাহর সময়কে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমৃদ্ধির কারণে বাংলার স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। তাঁর সময়ে শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। হোসেন শাহ নির্দেশ দেন কোথাও যাতে ধর্মপ্রচারে তাঁদের বাঁধা দেয়া না হয়। তিনি সাহিত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেকালে সাহিত্য চর্চা করতেন মূলত হিন্দু পন্ডিতেরা। মহাভারতের বঙ্গানুবাদ, মনসামঙ্গল, পান্ডববিজয় প্রভৃতি গ্রন্থের প্রারম্ভে হিন্দু পন্ডিতেরা কোথাও তাঁকে কলিযুগে কৃষ্ণের অবতার, কোথাও বা অর্জুনরূপে প্রশংসা করেছেন।

যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি। যদিও আজ থেকে শতাধিক বছর আগে প্রখ্যাত আর্কিওলজিষ্ট কানিংহাম ফিল্ড ভিজিটে এসে এটিকে দারসবাড়ি বা কলেজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং তার উপর ভিত্তি করেই একে সবচে প্রাচীন মাদ্রাসা রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে কিন্তু আমি যা দেখলাম স্থাপনাশৈলী আমাকে বৌদ্ধ বিহারগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলো। কে জানে হয়তো কোন এক পরিত্যক্ত বিহারের উপরেই গড়ে উঠেছিলো হয়তো এই মাদ্রাসা! ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া বাঁকের খবর কজনই বা রেখেছে!

 একটি ভিডিও লিংক দিলাম দারসবাড়ি মাদ্রাসার। দেখলে আইডিয়া পাবেন।

https://youtu.be/-I_7P1HG82I

13 Nov 2017

কুমারীকুন্ড, সীতাকুন্ড, চট্টগ্রাম



কুমারীকুন্ড:

পৌরাণিক এক অঞ্চল সীতাকুন্ড। পাহাড়ের এদিকে সেদিক শত শত ছড়া। একেকটা ছড়ায় একেক বিস্ময় লুকিয়ে রাখা। আজ তেমনি এক ছড়ায় খুঁজে পেলাম রহস্যময় এক প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। সম্ভবত প্রাচীন হিন্দুরা হট স্প্রিং বা উষ্ণ প্রস্রবণকে পবিত্র ভাবতেন। সীতাকুন্ডের প্রসিদ্ধ লবণাক্ষকুন্ড ও অগ্নিকুন্ড মূলত বুদবুদ করে বেরোনো গ্যাসে জালানো অগ্নিকুন্ডকে উপজীব্য করেই পীঠস্থান নামে গড়ে উঠেছে। হয়তো এটিও ছিলো সেরকমই কোন এক মন্দির। যুগের ব্যবধানে ও মূল তীর্থ অঞ্চল থেকে অন্তত দশ কিলোমিটার দূরত্বজনিত দূর্গমতার কারণে মানুষ যার কথা হয়তো বিস্মৃত হয়েছে। চিপা ঝিরির (আমার মত তীব্র আশাবাদী লোক ছাড়া ভুলেও কেউ এখানে সম্ভাবনার আশা দেখবেনা) ঝোপঝাড়ের ডালপালা ভেঙ্গে অনেকদূর যাবার পর হঠাৎ মাটি চাপা পড়া পুরোনো দিনের ইটের কাঠামো। তারই ভেতরে রীতিমত ক্রলিং করে ডুকে তাজ্জব বনে গেলাম। আট-দশ ফুট গভীর এক স্বচ্ছ নীল পানির পাথর দিয়ে বাঁধানো কূপ, চৌবাচ্চাও বলা যায়। স্বচ্ছ নীল পানির তলদেশ থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠছে। চারপাশের দেয়াল ধ্বসে গেছে সেই কবেই। আশেপাশে কাঠাল পেকে ঝরে পড়ে আছে, গাছে শুধু কাঁঠালের বোত্তা ঝুলছে। চারপাশে অদ্ভুদ শেপের সব পাথর। একদম অপরিচিত লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এই মন্দিরের নাম দূরে থাক কোন গল্পও শুনিনি কখনো। অথচ উদ্দেশ্যহীনভাবেই মিলে গেলো রত্ন। কুড়িয়ে পাওয়া রত্ন!

(এই জিনিস আমাকে বিস্ময়াভিভূত করেছে অথচ এখানে অল্প যা কিছু দরিদ্র মানুষের আনাগোনা কদাচিৎ ঘটে তাদের কাছে এই জিনিস তাৎপর্যহীন। এই এলাকায় ত্রিপুরারা আসে বাঁশ কাটতে। এরা হিন্দু কিন্তু এরাও তেমন কিছু বলতে পারেনা এই স্থাপনার ব্যাপারে কিন্তু এখানে আসতে ভয় পায়।

আমি এই জিনিস দেখার পর যে দুই চারজন মানুষ পেয়েছি হাটহাজারীর পথে সবাইকেই এটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। একজন ছাড়া কেউ বুঝতেই পারেনি এটা কি  বা কোথায়। যে একজন বুঝেছেন তিনি স্থানীয় বাঙালী এবং ইন্টারেষ্টিং তথ্য দিয়েছেন।

প্রথম তথ্য: তিনি তার বাবার কাছে শুনেছেন বৃটিশ আমলে বৃটিশরা নাকি মাঝে মাঝে এখানে এসে "লেংটা" হয়ে গোসল করতেন।

মন্তব্য: লজিকাল। হতেই পারে। হটস্প্রিং এ মানুষ দিগম্বর হয়েই নামে জাপানে। যদিও লজিকালি এটাকে ঠিক হট স্প্রিং বলা যায় না।

দ্বিতীয় তথ্য: বছর পনেরো আগে নাকি দুই সাধু বিশাল সব খাতা, তালপাতার পুথিপত্র নিয়ে এই এলাকায় আসেন। তার বাগান কাছে বিধায় তার সাথে দেখা হয়। তার সাথে দুই বিশাল সাদা দাড়ির সাধুর আলাপ হয়। দুই সাধু মন্দিরটা খুজছিলো। তখন নাকি মন্দিরের তলদেশে একটা " সোনার মূর্তি" ছিলো। (এই অংশ ইলজিকাল) পরে দুই সাধু নাকি এলাকার কিছু খারাপ প্রকৃতির লোককে হাত করে (ইলজিকাল) সোনার মূর্তি চুরি করে নিয়ে যায়। এর পরই নাকি বিশাল পাথরের দেয়াল ধ্বসে পড়ে। সেই পাথরের দেয়াল থেকে পাথর খুলে নিয়ে অনেকদিন জনৈক "কুজরইত্যা" শিলপাটা বানিয়ে বিক্রি করেছে। এখন নাকি আগের তুলনায় অল্প কিছু পাথর পড়ে আছে।

মন্তব্য: এই তথ্য বা গল্পে প্রচুর ফাঁক আছে। ঘটনা ফেব্রিকেটেড।)

22 Oct 2017

সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে নজরুল

সীতাকুন্ডে 'ট্রেকার' নজরুলের ঝর্ণাবিলাস



শুধু অপু নজরুল যে সীতাকুন্ডে যায় তা নয়, আজ থেকে ৮৮ বছর আগে কাজী নজরুলও গিয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের জানুয়ারিতে কাজী নজরুল সীতাকুন্ডে বেড়াতে আসেন। দলবল নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠেন, ঝর্ণায় গা ভেজান। ঝর্ণার পাশে বসে পোজ দিয়ে ছবিও তুলেন। ট্রেন থেকে নেমে সীতাকুন্ড রেলস্টেশনের পুব দিকের চন্দ্রনাথ রেঞ্জের দিকে তাকিয়ে মুখে মুখে গেয়ে উঠেছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত গান, "আকাশে হেলান দিয়ে, পাহাড় ঘুমায় ঐ!" মজার ব্যাপার হচ্ছে এত বড় বিদ্রোহী কবি ছিলেন জোকের ভয়ে কাতর। শেষে ফেরার পথে এমন অবস্থা হয় যে তাঁকে কয়েকজন ভ্রমণসঙ্গী মিলে কাঁধে চড়িয়ে পাহাড় থেকে নামাতে হয়।

চন্দ্রনাথ ভ্রমণ শেষে কবি সাম্পানে চড়ে সন্দ্বীপ বেড়াতে যান (এই বিষয়ে বিস্তারিত আগে ব্লগে লিখেছি। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন)।  "খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলে। তরঙ্গ লহর তোলে, লীলায়িত কুন্তলে।" অথবা "দূর দ্বীপবাসিনী, দারুচিনির দেশের তুমি বিদেশিনীগো, সুমন্দভাষিণী।" টাইপ মাষ্টারপিস গুলো তখনই লেখা!

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী, পতেঙ্গা, কাট্টলী, হাটহাজারীসহ বহু জায়গায় বেড়ান নজরুল। থাকতেন তামাকুমন্ডিলেনস্থ বন্ধুর বাসায়। সিন্ধু হিন্দোল রচনার শুরু পতেঙ্গা সৈকতে।

৮৮ বছর আগে সীতাকুন্ডের পাহাড়ে গায়ে আলখেল্লা জড়ানো নজরুলের বেশভূষা ও ব্যাকগ্রাউন্ডের ঝর্ণাটি খেয়াল করুন। দেখুন নজরুল যে পাথরটিতে বসে আছে সেটি। লক্ষ্য করতে ভুলবেন না আশেপাশের প্রকৃতি, পাথরে জন্মানো উদ্ভিদরাজি। স্থানটি কি কেউ শনাক্ত করতে পারছেন?

মনটা ভরে গেলো! সীতাকুন্ড ফরেভার! নজরুল ফরেভার!

13 Oct 2017

মুনীর চৌধুরী ও কাইয়ূম চৌধুরী : দুই ভাই দুই ভূবনে


ছবির বামপাশের ব্যাক্তির নাম ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ছিলেন কাকুলে অবস্থিত পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে সোর্ড অব অনার পাওয়া প্রথম বাঙালি সেনা কর্মকর্তা। ৭১ সালে তিনি একজন কর্ণেল হিসেবে যশোর ক্যান্টনমেন্টে দায়িত্বরত ছিলেন। ২৭ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টের সকল বাঙালি অফিসার-সৈনিক বিদ্রোহ করে ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করলেও কাইয়ুম চৌধুরী পক্ষত্যাগ করেননি। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হয়েই ৭১ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেই কন্টিনিউ করেন এবং ৭৪ এ ব্রিগেডিয়ার হিসেবে অবসর নেন। পাকিস্তানি জেনারেল প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমলে সচিব পদমর্যাদায় সরকারের তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ইসলামিক স্কলার হিসেবে পরিচিত হন এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ২০১৩ সালে মারা যাওয়ার আগে আর কখনো তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেননি।

ছবির ডানপাশের ব্যক্তির নাম শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী। যারা এদেশে পড়াশোনা করেছেন তারা সবাই উনার লেখা কবর ও রক্তাক্ত প্রান্তর নাটক পাঠ্য হিসেবে পড়েছেন। টাইপরাইটারের জন্য সবচে সাবলীল কিবোর্ড লে-আউটের ডিজাইন "মুনীর অপটিমাম"ও তাঁর করা যার ছায়া আমরা এখনও আমাদের ব্যবহার করা কিবোর্ডে দেখি। তিনি ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক ও সেজন্য জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। তাঁর সবচে বড় পরিচয় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তম প্রফেসর ছিলেন। নানা ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর ক্লাস করতো। ৭১ সালে তিনি ডিপার্টমেন্ট হেড ও পরে আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন ছিলেন। তাঁর কিশোর সন্তান সে সময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তাঁকে ৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আল-শামস বাহিনী বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।

সবচে আশ্চর্যজনক হলো দুইজন দুই মেরুর মানুষ হলেও তারা ছিলেন আপন দুই ভাই। নোয়াখালীর সন্তান। তাদের বাবা ছিলেন বৃটিশ আমলের জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী। উনার চৌদ্ধ সন্তানের সবাই স্ট্যান্ড করা-খ্যাতিমান। যার বিখ্যাত দুজন হলেন  জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরী ও খ্যাতিমান অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার।

কাইয়ুম চৌধুরীকে ইতিহাস ট্রেইটর হিসেবে মনে রাখবে নাকি একজন বিদূষী মানুষরূপে তা ইতিহাসের লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। কাইয়ূম চৌধুরী পক্ষত্যাগ করেননি। তাঁর কাছে হয়তো তার কমিশনের সময় নেয়া শপথ, তাঁর পাঞ্জাবী স্ত্রীর মোটিভেশনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তাছাড়া তিনি আর কখনো বাংলাদেশে না ফিরে এসে মজবুত ইমানের পরিচয় দিয়েছেন। এবং সেখানেও সফল হয়েছেন। অনেকটা আমাদের বর্তমান চাকমা রাজার বাবার মত যিনি স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন এবং আর কখনো দেশে না ফিরে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছিলেন।

এই লেখার উদ্দেশ্য হলো পরিবার,  জন্মভূমি, নিজ রেস বা জাতিসত্বার চাইতেও অনেক সময় যে দায়িত্ব, কর্তব্য,  পারিপার্শ্বিকতা অথবা সাহসের অভাব যে ভবিষ্যত নির্ধারণে বড় নিয়ামক হয়ে উঠে তা দেখানো। আর সেই দায়িত্ব-কর্তব্যবোধের সংজ্ঞাও নির্ধারিত হয় যার যার অবস্থান থেকে। আপেক্ষিকতার এই দুনিয়ায় ধ্রুব সত্য বা ধ্রুব অবস্থান বলে কিছু নেই কারণ পৃথিবীর সন্তানকে ছিন্নভিন্ন করা এই  মানচিত্র, সীমানা, ভিসা-পাসপোর্ট সবই বড় ঠুনকো যে!