30 Jul 2020

সকল সেলিব্রেটিদের খানা শেষ, মামুন-অফুর বাংলাদেশ!

সাকিব খান বা সাকিব আল হাসান না। এরাই বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি এক্টিভ ফ্যানওয়ালা সেলিব্রেটি! যাদের নামে থানায় থানায় ফ্যাব ক্লাব আছে!

সাকিব খান বা সাকিব আল হাসান না। এরাই বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি এক্টিভ ফ্যানওয়ালা সেলিব্রেটি! যাদের নামে থানায় থানায় ফ্যাব ক্লাব আছে!

সকল সেলিব্রেটিদের খানা শেষ, মামুন-অফুর বাংলাদেশ।

নোয়াখালীর বার্বার শপে কাজ করা অপু 'অফু বাই' নামে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন লাইকি ও টিকটকে। অফুর উইয়ার্ড হাসি, ক্রিপি হেয়ারস্টাইল ও অদ্ভুত সব ডায়ালগের জন্য এই তরুণকে মূলত রোষ্ট করতে করতে বিখ্যাত বানিয়েছে ইউটিউবাররা। সেকারণেই সে অল্প সময়ের মধ্যেও রিচের দিক দিয়ে মামুনকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখন সে ঢাকা এসে তার ফ্যানক্লাবের ফ্যানদের সাথে মিটআপ ও নতুন বান্ধবীদের সাথে ডেট করে বেড়াচ্ছে। তবে এই জগতেও আছে বিরোধ। তারই জের ধরে অফুর ফ্যানদের প্রিন্স মামুনের ফ্যানরা কদিন আগে মারধোর করেছে। এত কিছুর পরেও অফু বাই এর রিচ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

টিকটক লাইকির সুপারষ্টার বিশ বছর বয়সী প্রিন্স মামুনের ফলোয়ার দশ মিলিয়ন প্লাস বা এক কোটি সামথিং। সে টিকটক ও লাইকি এপে নেচে ও লিপ্সিং করে এত ভক্ত অর্জন করেছে। ঢাকার নানান গলি ঘুপচির মধ্যে নাচানাচি করে পপুলারিটি পেলেও তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তার ফ্যানরা এখন দিয়াবাড়ি, আগারগাঁও, টিএসসি, লালবাগ কেল্লা ও হাতিরঝিলকে পরিণত করেছে টিকটক পাড়ায়। অদ্ভুত ড্রেস আপ ও হেয়ার স্টাইলের শত শত টিন এজার ও তরুণ-তরুণীদের আজকাল মামুনের মত খ্যাতি পাবার আশায় এসব জায়গায় পথচারীদের বিব্রত করে নাচাগানার শুটিং করতে দেখা যায়। পাবলিক ন্যুনসেন্স তৈরী ও ইভটিজিং এর দায়ে গত সপ্তায় মামুনকে দিয়াবাড়িতে স্থানীয় ছেলেরা মারধোরও করেছে। তারপরেও শ্রমজীবি ও কালচারালি ডিপ্রাইভড ইয়ংস্টারদের মধ্যে মামুনের জনপ্রিয়তা কমে নাই। বরং তার নামে এলাকায় এলাকায় ফ্যান ক্লাবের মিট আপ চলছে। ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে মামুনও তার হলুদ R15 বাইক নিয়ে হাজির হচ্ছেন সেখানে৷ হবেন না কেন? বহু স্কুল ও গার্মেন্টসগামী কিশোর কিশোরীর স্বপ্নের নায়ক যে এখন টেন মিলিয়ন সেলিব্রেটি প্রিন্স মামুন!

যা লিখলাম এসব হলো আমার গত কয়েকদিনের ঘাটাঘাটিতে অর্জিত জ্ঞান। কিন্তু কিভাবে বা কেন এরা এত জনপ্রিয়তা পেলো? এই কোটি কোটি কিশোর কিশোরী কেন এদের মত উইয়ার্ড জিনিসপত্রকে আইডল মেনে নিচ্ছে?? এর কারণ আমার মতে সাংস্কৃতিক বঞ্চনা। বিপুল পরিমাণে শিশু কিশোর শ্রমজীবি আছে বাংলাদেশে যারা কালচারালি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে৷ ছয় দিন কাজ করে সপ্তম দিনের ছুটিতে অংশগ্রহণ মূলক একটা বিনোদন মাধ্যম পেয়ে তারা তা আকড়ে ধরেছে৷ কারণ গুরুত্বহীন বঞ্চনার জীবনকে ভুলে এখানেই আছে নায়ক হবার সুযোগ। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে অগভীর পারিবারিক মূল্যবোধের স্কুল কলেজে যাওয়া লাখ লাখ শিশু কিশোর যাদের বাবা মা কখনোই তাদের হাতে পড়ার বইয়ের বাইরের কোন বই হাতে তুলে দেয়নি, ঘুরতে নিয়ে যায়নি, খেলতে পাঠায়নি, পাশে বসিয়ে শোনায়নি কোন গল্প বা নীতিকথা।  সর্বোপরি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, সচেতন বা অসচেতনভাবে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বা বিনোদনের কোন ব্যবস্থাই করতে পারেনি। এদের অনেকেই খেলার মাঠ না পেলেও নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশের আগেই হাতে পেয়ে গেছে সেলফোন৷ তাই তথাকথিত সহজ জনপ্রিয়তার ট্রেন্ডি আর ফাংকি ব্যাপারগুলোই এদের মনোজগতের মনোযোগ পেয়েছে এবং দিনশেষে সেই ফাঁদেই পড়ে আছে বাচ্চাগুলো!

মানুষের বিনোদন পিপাসী হৃদয় শূণ্যতা চায়না৷ তাই যেখানে পজেটিভ বিনোদন থাকবেনা সেখানে এ ধরণের বিনোদনেই শূণ্যতা পূরণ হবে। দেশ যে একটি সাংস্কৃতিক দূর্ভিক্ষ বা cultural famine এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে টিকটক চর্চা ও টিকটক সেলিব্রেটিদের উত্থান তারই প্রমাণ।

এদের কারো সক্ষমতাকে আমি খাটো করছিনা। যে টিন স্পিরিট, স্বতস্ফুর্ততা আর প্রতিভার ছাপ এদের কর্মযজ্ঞে দেখেছি তা প্রশংসার দাবী রাখে৷ কিন্তু এই প্রতিভার সাথে সুসংস্কৃতি ও সুশিক্ষার চর্চার সুযোগ পেলে এদের প্রতিভা আরো বিকশিত হতো এবং কয়েকদিন পর হুট করে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতনের অভিজ্ঞতাটা ওদের হতোনা বলে আফসোসটা থেকেই যাচ্ছে! তারপরেও রইলো শুভকামনা!

অপু নজরুল
২৯-০৭-২০
নোয়াখালীর বার্বার শপে কাজ করা অপু 'অফু বাই' নামে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন লাইকি ও টিকটকে। অফুর উইয়ার্ড হাসি, ক্রিপি হেয়ারস্টাইল ও অদ্ভুত সব ডায়ালগের জন্য এই তরুণকে মূলত রোষ্ট করতে করতে বিখ্যাত বানিয়েছে ইউটিউবাররা। সেকারণেই সে অল্প সময়ের মধ্যেও রিচের দিক দিয়ে মামুনকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখন সে ঢাকা এসে তার ফ্যানক্লাবের ফ্যানদের সাথে মিটআপ ও নতুন বান্ধবীদের সাথে ডেট করে বেড়াচ্ছে। তবে এই জগতেও আছে বিরোধ। তারই জের ধরে অফুর ফ্যানদের প্রিন্স মামুনের ফ্যানরা কদিন আগে মারধোর করেছে। এত কিছুর পরেও অফু বাই এর রিচ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

টিকটক লাইকির সুপারষ্টার বিশ বছর বয়সী প্রিন্স মামুনের ফলোয়ার দশ মিলিয়ন প্লাস বা এক কোটি সামথিং। সে টিকটক ও লাইকি এপে নেচে ও লিপ্সিং করে এত ভক্ত অর্জন করেছে। ঢাকার নানান গলি ঘুপচির মধ্যে নাচানাচি করে পপুলারিটি পেলেও তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তার ফ্যানরা এখন দিয়াবাড়ি, আগারগাঁও, টিএসসি, লালবাগ কেল্লা ও হাতিরঝিলকে পরিণত করেছে টিকটক পাড়ায়। অদ্ভুত ড্রেস আপ ও হেয়ার স্টাইলের শত শত টিন এজার ও তরুণ-তরুণীদের আজকাল মামুনের মত খ্যাতি পাবার আশায় এসব জায়গায় পথচারীদের বিব্রত করে নাচাগানার শুটিং করতে দেখা যায়। পাবলিক ন্যুনসেন্স তৈরী ও ইভটিজিং এর দায়ে গত সপ্তায় মামুনকে দিয়াবাড়িতে স্থানীয় ছেলেরা মারধোরও করেছে। তারপরেও শ্রমজীবি ও কালচারালি ডিপ্রাইভড ইয়ংস্টারদের মধ্যে মামুনের জনপ্রিয়তা কমে নাই। বরং তার নামে এলাকায় এলাকায় ফ্যান ক্লাবের মিট আপ চলছে। ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে মামুনও তার হলুদ R15 বাইক নিয়ে হাজির হচ্ছেন সেখানে৷ হবেন না কেন? বহু স্কুল ও গার্মেন্টসগামী কিশোর কিশোরীর স্বপ্নের নায়ক যে এখন টেন মিলিয়ন সেলিব্রেটি প্রিন্স মামুন!

যা লিখলাম এসব হলো আমার গত কয়েকদিনের ঘাটাঘাটিতে অর্জিত জ্ঞান। কিন্তু কিভাবে বা কেন এরা এত জনপ্রিয়তা পেলো? এই কোটি কোটি কিশোর কিশোরী কেন এদের মত উইয়ার্ড জিনিসপত্রকে আইডল মেনে নিচ্ছে?? এর কারণ আমার মতে সাংস্কৃতিক বঞ্চনা। বিপুল পরিমাণে শিশু কিশোর শ্রমজীবি আছে বাংলাদেশে যারা কালচারালি আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে৷ ছয় দিন কাজ করে সপ্তম দিনের ছুটিতে অংশগ্রহণ মূলক একটা বিনোদন মাধ্যম পেয়ে তারা তা আকড়ে ধরেছে৷ কারণ গুরুত্বহীন বঞ্চনার জীবনকে ভুলে এখানেই আছে নায়ক হবার সুযোগ। এদের সাথে যুক্ত হয়েছে অগভীর পারিবারিক মূল্যবোধের স্কুল কলেজে যাওয়া লাখ লাখ শিশু কিশোর যাদের বাবা মা কখনোই তাদের হাতে পড়ার বইয়ের বাইরের কোন বই হাতে তুলে দেয়নি, ঘুরতে নিয়ে যায়নি, খেলতে পাঠায়নি, পাশে বসিয়ে শোনায়নি কোন গল্প বা নীতিকথা।  সর্বোপরি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, সচেতন বা অসচেতনভাবে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা বা বিনোদনের কোন ব্যবস্থাই করতে পারেনি। এদের অনেকেই খেলার মাঠ না পেলেও নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশের আগেই হাতে পেয়ে গেছে সেলফোন৷ তাই তথাকথিত সহজ জনপ্রিয়তার ট্রেন্ডি আর ফাংকি ব্যাপারগুলোই এদের মনোজগতের মনোযোগ পেয়েছে এবং দিনশেষে সেই ফাঁদেই পড়ে আছে বাচ্চাগুলো!

মানুষের বিনোদন পিপাসী হৃদয় শূণ্যতা চায়না৷ তাই যেখানে পজেটিভ বিনোদন থাকবেনা সেখানে এ ধরণের বিনোদনেই শূণ্যতা পূরণ হবে। দেশ যে একটি সাংস্কৃতিক দূর্ভিক্ষ বা cultural famine এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে টিকটক চর্চা ও টিকটক সেলিব্রেটিদের উত্থান তারই প্রমাণ।

এদের কারো সক্ষমতাকে আমি খাটো করছিনা। যে টিন স্পিরিট, স্বতস্ফুর্ততা আর প্রতিভার ছাপ এদের কর্মযজ্ঞে দেখেছি তা প্রশংসার দাবী রাখে৷ কিন্তু এই প্রতিভার সাথে সুসংস্কৃতি ও সুশিক্ষার চর্চার সুযোগ পেলে এদের প্রতিভা আরো বিকশিত হতো এবং কয়েকদিন পর হুট করে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পতনের অভিজ্ঞতাটা ওদের হতোনা বলে আফসোসটা থেকেই যাচ্ছে! তারপরেও রইলো শুভকামনা!

অপু নজরুল
২৯-০৭-২০

13 Jul 2020

চুতিয়া সমাচার

চুতিয়া সমাচার

কয়েক বছর আগে আসামের গুয়াহাটি শহরে পদব্রজে ভ্রমণের সময় শহরের ব্যস্ততম ফেন্সীবাজারে রাস্তার ধারে অসমিয়া ভাষায় লেখা এক দেয়াল লিখনে চোখ আটকে যায়। অসমিয়া বর্ণমালা প্রায় বাংলার মতোই তাই পড়া ও বুঝা যায়।  দেয়ালে লিখা ছিলো 'চুতিয়া সন্মিলন' এ যোগদানের আহবান। ব্যাপারটা আজব লেগেছিলো!

সেইসময় ইন্ডিয়ান সিম একটিভ না থাকায় ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম তাই  তাৎক্ষণিকভাবে কিছুই জানা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি নিউজ নজরে পড়ে। নিউজটি আপনাদের জন্য শেয়ার করছি:

"নামের সঙ্গে ‘চুতিয়া’ শব্দটি থাকলেই অ্যাকাউন্ট বাতিল করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে ফেসবুকের বিরুদ্ধে।
শব্দটি উপমহাদেশে গালি হিসাবে ব্যবহৃত হওয়ায় অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, তবে এ নিয়ে বিপাকে পড়ছেন আসাম রাজ্যের ‘চুতিয়া’ সম্প্রদায়ের লোকজন। ‘দ্যা অল আসাম চুতিয়া স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ বা আসাকসু অভিযোগ করেছে তাদের সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয়া হয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি প্রসাদ চুতিয়া জানান, ফেসবুক আমাদের ‘চুতিয়া’ সম্প্রদায়ের সব সদস্যের অ্যাকাউন্ট বাতিল করে দিয়েছে, নামের শেষে চুতিয়া শব্দটি থাকায় ফেসবুক এটিকে গালি বা মিথ্যা শব্দ মনে করে হয়ত অ্যাকাউন্টগুলো বাতিল করছে। ফেসবুক জানেনা যে ‘চুতিয়া’ হচ্ছে আসামের একটি উপজাতি। অথচ জাতীয় ইতিহাসে আমাদের এ উপজাতির ইতিহাস অনেক গৌরবমণ্ডিত। চুতিয়া সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বলেছে, এ ঘটনাটি আমাদের উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য সম্মানহানির। শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় গুয়াহাটিতে এক মিটিংয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘চুতিয়া’ কমিউনিটির ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।"

চুতিয়ারা বাস করে মধ্য আসাম ও অরুণাচলের কাছাকাছি উত্তর আসামে। ডিব্রুগড়, শোণিতপুর, জোড়হাট, সাদিয়া ও তিনশুকিয়াতে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ লাখ চুতিয়ার বাস। চুতিয়াদের আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। দশম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বছর তারা স্বাধীন চুতিয়া রাজ্যে বসবাস করতো। এ সময় আশেপাশের নানা জনজাতির সাথে নানা যুদ্ধে জয়লাভ করেই তারা তাদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রেখেছিলো। তাদের বীরাঙ্গনার নাম সতী সাধনী। বহুদিন ধরেই চুতিয়া জাতি ডিব্রুগড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর নির্মানাধীন ভারতের সর্ববৃহৎ দোতলা সেতুর (বগীবিল সেতু) নামকরণ সতী সাধনী সেতু করার দাবী করে আসছে।

এক দেশের গালি আরেক দেশের বুলি। যেমন ভুটানে গেলে মেয়েদের সবচে কমন নাম হলো Choden! যাই হোক এরপরের বার আসাম গেলে একটা না একটা চুতিয়া বন্ধু জুটিয়ে আসতে হবে!

3 Jul 2020

ছবিটি আমার প্রিয় একটি এপিটাফের। ছোটবেলা থেকেই চট্টগ্রামের কাট্টলী অঞ্চলের এই কবরের পাশ দিয়ে নিয়মিত চলাফেরা করেছি, অনেক সময় দিনে একাধিকবারও। উনার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না তখন, শুধুমাত্র উনার এপিটাফ পড়ে উনাতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। জীবিতাবস্থায় এতো চমৎকার একটি হৃদয় ছোয়া এপিটাফ যিনি রচনা করেছেন তার সম্বন্ধে নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায় যে তিনি একজন জ্ঞানী, মহান, উদার ও আধুনিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁর জীবনের কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অধ্যায় সবার সাথে শেয়ার করছি। 

মরহুম মুফতি মাওলানা তমিজুর রাহমান ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, ইতিহাসবিদ, বাংলা, উর্দু, ফার্সি ও আরবিতে সমান দক্ষতা থাকায় তাঁকে বহুভাষাবিদও বলা যেতে পারে। তিনি বহু কিতাব রচনা করেন যেগুলো কালের গর্ভে সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে। তিনি মহাকবি ইকবালের শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া কাব্যগ্রন্থদ্বয়ের বাংলা অনুবাদ করেন। তাছাড়া ইকবালের আরেক মহান কাব্য "আশরারে খুদি ও রামুজে বেখুদি" বাংলায় অনুবাদ করে তিনি বিদ্যান মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। প্রকাশিত কিতাব ছাড়াও তাঁর আরো অনেক অনুবাদের পান্ডুলিপি তাঁর মৃত্যুর পর যথাযত সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যায়।

ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তিনি একজন আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাক্তি ছিলেন। একজন মুফতি হিসেবে বহু বিতর্কিত বিষয়ে গ্রহনযোগ্য ফতোয়া বা সমাধান দিয়ে তিনি তৎকালীন আলেম সমাজে সুনাম অর্জন করেছিলেন। 

কাট্টলী নূরুল হক স্কুল স্থাপনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। তাছাড়া আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদের বেদখল হয়ে যাওয়া বহু জমি মামলা লড়ে এবং বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ পূণরুদ্ধারের  মাধ্যমে উদ্ধার করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

বৃটিশ আমলে কবি নজরুলের সাথে তাঁর পত্র যোগাযোগ ছিলো৷ কবি চট্টগ্রাম আসলে তিনি তাঁকে কাট্টলী গ্রামে আমন্ত্রণ জানান এবং বিশাল সংবর্ধনা দেন। নজরুলের আগমণ উপলক্ষ্যে তিনি একটি বিশাল কবিতা রচনা করেন যা নজরুল সংবর্ধনায় তিনি পাঠ করেন। কবিতাটির একাংশ নিন্মে উল্লেখ করা হল,

" আজ আমাদের গুলশানেতে
ফুল ফুটেছে শীতকালে,
অগ্নিবীণার বুলবুলিটি
গাইঁবে গজল ডালে ডালে!
...........................

আয়রে দোয়েল, আয় পাপিয়া
ভক্তি গুলের হার গাঁথিয়া,
আগমনীর নজরানা দে
বিশ্বকবি নজরুল গলে!
গরীব দেশে আর কি আছে
তৌফা দিতে চরণতলে?"

তাঁর জন্ম যে বাড়িতে সে বাড়ি আজো তমিজ বাড়ি নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে সে বাড়িতে জহুর আহমেদ চৌধুরীর মতো  মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী মহান নেতার জন্ম হয়।  তিনি বাংলাদেশের প্রথম শ্রমমন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর নামে জহুর হকার্স মার্কেট ও বিভাগীয় স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়।  তারপরও তমিজ সাহেবের নামেই আজো সেই বাড়িটি পরিচিত। অথচ আজকাল এই মহান ব্যাক্তির জীবন ইতিহাস সম্পর্কে  তেমন কোন সচেতনতা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা।

১৮৭৮ সালে জন্ম নেয়া মহান এই ব্যাক্তি ১৯৫০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বেই তিনি তাঁর এপিটাফটি লিখে যান, এবং তাঁর অছিয়ত অনুসারে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবরে এপিটাফটি স্থাপিত হয়!

এপিটাফটি নিন্মরূপঃ

"এ পথে গমণকালে ওহে বন্ধুগণ
নিরাশ্রয় তমিজেরে করিও স্মরণ
দাঁড়াইয়া সমাধির পাশে দয়া করে
দোয়া করিবেন মম মুক্তির তরে!"

**লেখাটি ২০১২ সালে লিখেছিলাম, আজ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম লেখাটি এই আইডি থেকে পোষ্ট দেয়া হয়নি৷ তাই দিয়ে রাখলাম। তথ্যের জন্যে রফিক আহমেদ চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
আজ ছিলো এভারেষ্ট দিবস। নিউজিল্যান্ডের নাগরিক এডমুন্ড হিলারী (পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনারও ছিলেন) আর শেরপা তেনজিন নোরগের ১৯৫৩ সালে এভারেষ্ট চূড়া আরোহণের ৬৭তম বার্ষিকী। তবে ভাগ্য সহায় হলে আরো অনেক আগেই এভারেষ্ট আরোহন করে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখাতে পারতেন জর্জ ম্যালোরি। ভাগ্য বিড়ম্বিত এই পথিকৃত পর্বতারোহী ১৯২৪ সালে তাঁর তৃতীয় এভারেষ্ট অভিযানে সঙ্গী আরভিনসহ নিখোজ হয়েছিলেন। যোগাযোগহীনতার সে যুগে নিশ্চিত হওয়া যায়নি নিখোঁজ হবার সময় তিনি চূড়ায় উঠছিলেন নাকি সামিট শেষে ফিরে আসছিলেন। তারপর কত নদী সরোবর হিমালয়ের বরফ গলা জলে সিক্ত হলো, কত ঝড়-ঝঞ্ঝা ছুঁয়ে গেলো হিমালয়ের হিমশীতল কোল, কেটে গেলো অনেক অনেক বছর। শুভ্র হিমবাহের ধবল দীপ্তিমাখা হিম বহুবছর আগলে রাখলো ম্যালোরীর মৃতদেহ। অবশেষে ১৯৯৯ সালে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কাছে হার মেনে বরফ গলে ম্যালোরির মৃতদেহ দৃশ্যমান হলো। ১৮৮৬ তে জন্ম নেয়া ম্যালোরির বয়স ১৯২৪ সালে ছিলো ৩৮। নিহত হবার আরো ৭৫ বছর পর ১৯৯৯ সালে ম্যালোরির ১১৩ বছরের পুরোনো দেহখানা যখন আবিস্কৃত হলো হিমাঙ্কের নিচের ফ্রিজিং টেম্পারেচারে তখনো প্রকৃতি মাতা তুষারের চাদর বিছিয়ে রেখে তাঁকে সংরক্ষণ করে রেখেছে একদম অবিকৃতভাবে। অথচ ইতিমধ্যে তারই পরবর্তী দু'প্রজন্ম স্বাভাবিক পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় জীবন ধারণ শেষে জরাক্রান্ত হয়ে/অপঘাতে পরমায়ু ফুরিয়ে ঠাই নিয়েছে কবরে। নিজস্ব নিয়মেই তাদের দেহবশেষও গ্রাস করে নিয়েছে প্রকৃতি। মাটির পৃথিবীতে মাটি হয়ে হারিয়ে গেছে তারা!

আচ্ছা আরেকটু বুঝিয়ে বলি; ধরে নিলাম ২৫ বছর বয়সী এক  পর্বতারোহী হারিয়ে গেলেন পর্বতগাত্রে তার ১ বছরের পিতার স্মৃতিহীন সন্তানকে রেখে, হয়তো ৭৫ বছর পর কোন উদ্ধারকারী দল সেই পিতার তুষারের হিমঘরে অবিকৃত হয়ে থাকা লাশকে উদ্ধার করলো। ৭৫ বছর বয়সী সন্তান যখন পিতার লাশের মুখোমুখি হবে কি অদ্ভুত অনুভূতিটাই না তার হবে! তার সামনে যে পিতার লাশ মহাকালের সাপেক্ষে তার বয়স ১০০ কিন্তু তার চেহারা বলছে সেটি আটকে গেছে পঁচিশে! এ যেন পরাবাস্তবতার মুখোমুখি দাড়ানো, মুখে বলিরেখার ত্রিকোণমিতি আঁকা ৭৫ বছরের বৃদ্ধ পুত্রের সামনে এ যেন ২৫ বছরের সতেজ তরুণ পিতা! প্রকৃতির কোন নিয়ম নেই, প্রকৃতি চলে তার  আপন খেয়ালেঃ হিমালয়ের হিম আলয়ে মৃত্যুর আনাগোনা থাকলেও বার্ধক্যের জরা ছুতে পারেনা কাউকে। দেবাত্মা হিমালয়ে তাই আজো অমরত্বের হাতছানি, তাই হয়তো ছুটে যেতে হয় বারে বারে।

(৭৫ বছর পর ম্যালোরীকে উদ্ধারের ভিডিওটাও দিলাম, এটা না দেখলে ফিল পাবেন না। ম্যালোরী আর তার কন্যার একটা ছবিও দিলাম। ম্যালোরীর মৃতদেহ যখন ৭৫ বছর পর হিমালয়ের হিমঘর থেকে অবিকৃত উদ্ধার হলো তারও অনেক আগেই সেই শিশু বৃদ্ধা হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অন্য পৃথিবীতে৷ একারণেই হয়তো লোককথায়, ধর্মে, মিথে বলে হিমালয় দিতে পারে চিরতারুণ্য। আসলেই পারে, তবে মৃত্যুই হলো সেই চিরতারুণ্যের দুয়ার!)



"বইবিহীন লোক মানুষই হয়না"

আমি কোনদিনই সে অর্থে ফটোগ্রাফার না। তবু কয়েকবছর আগে  আমার একটা ছবি দেখে আনন্দ পেয়ে এক ভদ্রলোক কিছু অর্থ উপহার হিসেবে দিতে চাইলেন। আমি বিনীতভাবে প্রত্যাখান করায় তিনি তাঁর গ্রামে আতিথ্য গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। ঘুরতে আমার কখনোই না নাই, তাই অজানা অচেনা একটা মানুষের আমন্ত্রণে চলে গিয়েছিলাম বিক্রমপুরে। যাবার পথে ভদ্রলোক টিফিন ক্যারিয়ার খুলে খাওয়ালেন ঘরে তৈরী সুস্বাদু ফুলকপির বড়া। আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শুনে উনি জানালেন উনার মেয়েও ঢাবিতে চারুকলায় পড়ে। খুব নাকি বিখ্যাত, নাম অমুক। চিনি কিনা জানতে চাইলেন। আমি না চিনতে পারায় বেশ হতাশ হলেন ভদ্রলোক! তাঁর হতাশ মুখে সেদিন আমি দেখেছিলাম কন্যাকে নিয়ে গর্বিত এক বাবাকে! বাস থেকে নামার পর ইছাপুরা বাজারে মিষ্টি খাওয়ালেন উনার এক ভাবশিষ্য। তখনই জানলাম উনি কমিউনিষ্ট পার্টি মুন্সিগঞ্জ জেলার সেক্রেটারী ছিলেন। তারপর পদব্রজে ভ্রমণ শুরু।সেদিন দুজনে মিলে হেটেছিলাম গ্রামের পর গ্রাম। ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন কাকলদী, মালবদী, মালখানগর স্কুল, বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি, মানিকের বাড়ি, সুবচনী খালসহ নানা দ্রষ্টব্য স্থান। পথে তিনি এখানে থামেন, সেখানে থামেন। গল্প জুড়ান কৃষকের সাথে, বাজারের দোকানীর সাথে, নারী নেত্রীর সাথে। কথায় কথায় নিজেকে দাবী করছিলেন 'মফিজ কবি' হিসেবে। গর্ব করে বলছিলেন তার প্রকাশনী থেকে অধ্যবধি লস হবে জেনেও প্রকাশ করেছেন ৬০০ কবিতার বই। বলছিলেন তার ভ্রমণের গল্প। আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তেতুলিয়ায় তার গড়া কোন এক অজ্ঞাতবাসে! যার নাম দিয়েছেন শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র। (প্রথম ছবি) বললেন তাঁর স্বপ্ন সারাদেশেই তিনি গড়বেন এরকম অনেকগুলো শুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র যেখানে কবি-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী, ভাবুকরা গিয়ে নিশ্চিন্তে চিন্তা ভাবনা করবেন বিনে পয়সায়। পরের ব্রাঞ্চ খুলতে চান  কুয়াকাটায়। ভাবনার জন্য নাকি সাগর জরুরী! সারাদিন ঘুরে,  ভরপেট পোলাও-কোর্মা সাটিয়ে ফেরার সময় কয়েকটা বই উপহার দিয়েছিলেন। (তৃতীয় ছবি) বলেছিলেন যোগাযোগ রাখতে। ফেসবুকে লাইক-কমেন্ট দিতে। ষাট ছুঁই ছুঁই ভদ্রলোকের এই ছেলেমানুষি আবদারে হেসে ফেলেছিলাম। তারপর বহু দিন গড়িয়ে গেছে।  জাগতিক ব্যস্ততায় তেতুলিয়ায় উনার অজ্ঞাতবাসে আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। যোগাযোগও রাখা হয়নি কয়েক বছর। গতবছর এই দিনে হঠাৎ সকল টিভি চ্যানেল-পত্রিকা মারফত জানলাম বোকাসোকা পাগল লোকটাকে নিজ গ্রামে দিনেদুপুরে বোমা ফাটিয়ে গুলি করে খুন করেছে তথাকথিত  ঈশ বা নব্য জেএমবি। কারণ লোকটা নাকি নাস্তিক ছিলেন।

লোকটার একটা কথা এখনো কানে বাজে,
"বইবিহীন লোক মানুষই হয় না!"

লোকটার নাম শাহজাহান বাচ্চু!



একজন পাগলা রাজার কীর্তি

একজন 'পাগলা রাজা'র কীর্তি

নাটোর দিঘাপতিয়ার জমিদার বাবু শরৎ কুমার রায় এর মদ বা বাইজি নাচানোর নেশা ছিলোনা। দেড়শো বছর আগের অনগ্রসর অসচেতন টালটামাল সময়েও এই লোক খুঁজে বেড়াতেন হারানো দিনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কোন মজা পুকুরে বা দূরের জমিদারীতে কোন নিদর্শনের সন্ধান মিললেই ভদ্রলোক হাতি সমেত ছুটে যেতেন তা উদ্ধারে। আড়ালে-আবডালে লোকে বলতো পাগলা রাজা। তাতে থোড়াই কেয়ার করতেন শরৎবাবু। তিনি বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠা করে তার মাধ্যমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরে অনুসন্ধান চালান। একপর্যায়ে তাঁরই দান করা জায়গায় ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম জাদুঘর 'বরেন্দ্র জাদুঘর'। দেশের সবচে সমৃদ্ধ জাদুঘরের স্বপ্নদ্রষ্টা শরৎ কুমার রায় সম্পর্কে জন্ম মৃত্যুর সাল ছাড়া তেমন ডিটেইলস কোন তথ্য কোথাও নেই। জানা যায় ভদ্রলোক ছিলেন সুলেখক, শিক্ষানুরাগী, কৃষকবান্ধব ও  অসাম্প্রদায়িক। তাঁর বেশিরভাগ কর্মচারীই ছিলেন মুসলিম। কৃষকদের স্বার্থেই তিনিই রাজশাহী অঞ্চলে প্রথম কৃষি কলেজ ও চিনিকল প্রতিষ্ঠা করেন। শরৎ বাবুর রবীন্দ্রনাথের সাথে ভালো যোগাযোগ ছিলো কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো হারিয়ে গেছে। লোকে যতোই পাগলা রাজা বলুক ভদ্রলোক নি:সন্দেহে তাঁর যুগের চেয়ে অগ্রসর ছিলেন। নয়তো দেশের সবচে সমৃদ্ধ জাদুঘরখানা আমরা পেতাম না। আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তবে রাজশাহী বরেন্দ্র যাদুঘরের সামনে শরৎবাবুর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করতাম।


গত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ফ্রান্সে প্রদর্শনীর নাম করে এর নিদর্শন সমূহ ফ্রান্সে পাঠানোর মাঝপথে সচেতন নাগরিকদের প্রতিবাদে তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ আছে ফ্রান্সে পাঠানো সব নিদর্শন আর ফেরত আসেনি। ৬৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের দায়িত্বে থাকলেও মনে হয়না তাদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিকতা আছে। সেকারণেই বরেন্দ্র যাদুঘরের উচ্চমানের সংগ্রহ দেখে মন ভরে গেলেও এর কিছু নিদর্শন খোলা লনে যেখানে সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে রাখা দেখে অবাক হলাম। দায়িত্বশীল ব্যক্তি বললেন এর কারণ স্থানাভাব কিন্তু আমি দেখলাম মুসলিম ঐতিহ্য নামের একটি পুরো গ্যালারী বুলশিট সব জিনিসপত্র দিয়ে ঠেসে জায়গা নষ্ট করা হচ্ছে! অথচ অমূল্য নিদর্শনগুলো রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে।

দুই-আড়াই হাজার বছরের আদি নিদর্শনে সমৃদ্ধ বরেন্দ্র জাদুঘরকে রক্ষা করবে কে?
সদ্যপ্রয়াত সাইফুল আজম ছাড়াও পাক এয়ার ফোর্সে আরো অনেক লিজেন্ডারি বাঙালি ফাইটার ছিলেন। তাঁদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখার প্রথম পর্বে আজ লিখবো ফ্লাইং অফিসার ওয়ালিদ এহসানুল করিমকে নিয়ে। বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। (গ্রাম চকোরিয়ার হারবাং) বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর ও ওয়ালিদ ১৯৬৩ সালে যখন একইসাথে জিডি পাইলট হিসেবে কমিশন পান তখন ওয়ালিদের সোর্ড অব অনার পাবার কথা ছিলো৷ কিন্তু পাসিং আউটের অল্প কিছুদিন আগে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিয়ে অবাঙালি ব্যাচমেটদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে সোর্ড অব অনার থেকে বঞ্চিত করা হয়৷ তা সত্বেও যেহেতু ওয়ালিদ ছিলেন তাঁর ব্যাচের সেরা পাইলট তাই তাঁকে পাক এয়ার ফোর্সের শ্রেষ্ঠ ফাইটার ইউএস মেড স্যাবর F86 এর পাইলট মনোনীত করা হয়। ১৯ বছর বয়সী ওয়ালিদ ছিলেন তখনকার সময়ে সারা বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী F86 পাইলট। F86 নিয়ে নানান আনকনভেনশনাল স্ট্যান্ট দেখিয়ে ওয়ালিদ বাহিনীর ভিতর ও বাইরে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতের গুজরাটে এয়ার স্ট্রাইক পরিচালনার সময় ওয়ালিদের F86 ফাইটার বিমান বিধ্বংসী কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়৷ সে অবস্থাতেই ইজেক্ট না করে ফিরে আসার চেষ্টাকালে ওয়ালিদের ফাইটার আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। বাঙালি পাইলট ওয়ালিদের লাশ বা তাঁর ফাইটারের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি!



(ওয়ালিদের বাবা ছিলেন হারবাং এর সম্ভ্রান্ত জমিদার ও কক্সবাজার পৌরসভার প্রথম মেয়র ফজলুল করিম। পর্যটন প্রসারের জন্য কক্সবাজার সৈকতের ঝাউগাছগুলো তাঁর সময়েই রোপন করা হয়।)

F86 saber jet

ছবিতে ওয়ালিদের সাথে আরো দুইজন বাঙালি আছেন। একজন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর। আরেকজন এয়ার ভাইস মার্শাল মমতাজ। সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান। গত বছর মারা গেছেন।